৩১শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইউনেস্কোতে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

আপডেট : জুলাই ১৫, ২০২০ ১১:২৯ অপরাহ্ণ

282

দুইহাজার সতেরো সালের তিন মার্চ,দুপুরে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন সাংবাদিক নয়ন মামুন। গার্দুনর্দ থেকে সুহেলভাই আমাকে মামুনের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করছিলেন সাংবাদিক আবু তাহিরসহ প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাবের বেশ ক’জন সদস্য। দীর্ঘ আড্ডা শেষে দারুন সব মুখরোচক বাংলা খাবারে ভুড়িভোজন চলে।খেতে খেতে আমাদের কত কথা!

সেদিন মামুনভাইয়ের বাসায় থাকাবস্থায় ইউনেস্কো আয়োজিত আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা উদযাপন অনুষ্ঠানে হঠাৎ আমন্ত্রন পাই । তখন আমি অনলাইন পোর্টাল ঢাকাটাইমসে খন্ডকালিন কাজ করি। দুইহাজার ষোল সালের তিন মার্চ প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা থেকে এসেছেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর এমপি’র নেতৃত্বে সঙ্গীতশিল্পী সামিনা চৌধরী, ফকির শাহাবুদ্দীন, নৃত্যশিল্পী রাচেল প্রিয়াংকা প্যারিসসহ একটি সাংস্কৃতিক দল । বাংলাদেশ, ভারত, চীন, সৌদি আরব, লিথুনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক,ইরানসহ ইউনেস্কোর স্থায়ী সদস্য ১২ টি দেশের অংশগ্রহনে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। অনুষ্ঠানের শুরুতে ইউনেস্কো প্রধানের স্বাগত বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখেন আসাদুজ্জামান নুর এমপি। তিনি বক্তব্যের শেষে সৈয়দ শামসুল হকের বিখ্যাত কবিতা নূরুলদীনের সারাজীবন থেকে আবৃত্তি করেন। পুরো বক্তৃতাটি তাৎক্ষনিকভাবে দর্শক শ্রোতাদের জন্য ফ্রেঞ্চ, ইংরেজী ভাষায় অনুদিত করে শোনানো হয়।

মিডিয়া গ্যালারিতে বসে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সাথে অনুষ্ঠানটি আমার কাভার করার সুযোগ হয়েছিল। আমাদের সারিতে সাংবাদিক আবু তাহির, ফেরদৌস আখঞ্জি, নয়ন মামুনসহ অন্যান্য দেশের বেশ ক’জন সাংবাদিক ছিলেন। তারাও নুরভাইয়ের আবৃত্তি বেশ উপভোগ করেন।

আসাদুজ্জামান নুরভাইয়ের বক্তব্যের পরপরই মঞ্চে গান গাইতে উঠেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, আমাদের প্রিয় সোমা আপা মানে সামিনা চৌধুরী। তার সাথে দু’জন মাত্র যন্ত্রী। একজন কী-বোর্ডিস্ট, একজন তবলাবাদক। দু’জনেই স্থানীয় শিল্পী। সোমাআপা তার বিখ্যাত গান শুরু করেন ” জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, আর কতদিন বল সইবো , আবার আদেশ করো তুমি আদেশ করো, ভাঙ্গনের খেলা খেলবো। ” কিন্তু বিধিবাম। স্থানীয় যন্ত্রীবাদক দু’জন এই চারলাইনের সাথে তাল লয় সুর মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন।
আপা গান থামিয়ে দিলেন। আমরা কিছু বোঝার আগেই তিনি উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে দ্রুত ব্যাকস্টেজে ফিরে যান। কি হলো, কি হলো আমাদের সবার মধ্যে গুঞ্জন। আমি দ্রুত ডেস্ক ছেড়ে ব্যাকস্টেজে গিয়ে দেখি আপা রাগে ক্ষোভে ফুঁসছেন। এরমধ্যে নুরভাই ও হাই কমিশনের দু’একজন ছুঁটে এসেছেন। নুরভাই সোমা আপাকে কিছু বলার আগে ফকির শাহবুদ্দীনকে মঞ্চে পাঠিয়ে দেন। মঞ্চে উঠে তিনি গাইতে শুরু করেন শাহ আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান ” আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম,আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম,গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম..”।সাথে সাথে পুরো হলভর্তি দর্শক করতালি ও গলা মিলিয়ে মাতিয়ে তোলে।

এদিকে নুরভাই বুঝিয়ে সুঝিয়ে সোমা আপার রাগ ক্ষোভ প্রশমিত করেন। নুরভাই হলের ভেতর চলে যাবার পর সোমাআপাকে নিয়ে বাহিরের লবিতে আসি। কফিভেন্ডার হতে দু’টো কফি নিয়ে খেতে খেতে আমরা কথা বলি।
-বুঝলি, আমি ঢাকা থেকে হাইকমিশনকে বারবার বলেছি অন্তত দু’জন যন্ত্রশিল্পীকে নেয়ার ব্যবস্থা করেন।তারা সেটা করলোই না। এতো টাকা পয়সা খরচ করে আমাদের আনতে পারলে, আরো দু’জন যন্ত্রশিল্পী এলে কি অনেক টাকা খরচ হতো? আজ তাদের গাফলতির জন্য দেশের মানসম্মান ডুবলো।

সোমা আপা কফি শেষ করে বললেন, আমি গাইবো কিন্তু কোন যন্ত্রী নিবো না। ওদের সাথে কোন রিহার্সেল করার সুযোগ হয়নি। বেচারারা আমার স্কেলে তাল মেলাতে পারবে না। আজকের ঘটনার জন্য হাইকমিশন দায়ী। ভেতরে চল, ফকিরের পর আমি দু’টো গান গাইবো।
আপাকে ব্যাকস্টেজে পৌছে দিয়ে আমি প্রেস গ্যালারিতে এসে বসি। স্টেজে তখন ফকির শাহাবুদ্দীন। তিনি একের পর এক লোকসংগীত গেয়ে দর্শক মাতিয়ে রেখেছেন। ফকির শাহাবুদ্দীনের পর সামিনা চৌধুরী না উঠে মঞ্চে আসেন নৃত্যশিল্পী রাচেল প্রিয়াংকা প্যারিস। তিনি পরপর দু’টো ভরতনাট্যম ও গৌড়ীয় নৃত্য পরিবেশন করেন। এরপরই আসেন সবার কাংখিত শিল্পী সামিনা চৌধুরী। তিনি যন্ত্রশিল্পীদের ছাড়াই পুনরায় গাইলেন ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’। একে একে গাইলেন তিনটি গান “একবার যদি কেউ, কবিতা পড়ার প্রহর, ফুল পথে ফুল ঝরে “।

বাংলাদেশের পরিবেশনা শেষে চীন , ইরান,ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্যদেশের শিল্পীরা তাদের সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে।
বাংলাদেশ থেকে আগত সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনা শেষে হল থেকে বের হয়ে যাই। লবিতে দেখা হল শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিনের সাথে। কফি খেতে খেতে দীর্ঘ আড্ডায় উঠে আসে একুশে টিভি, গানের অনুস্টান বাউলা অন্তর, প্রযোজক কামরুজ্জামান রঞ্জু, মানিক শিকদার, বাবুল আক্তারসহ অনেকের কথা। আমাদের হাসি আড্ডায় ইউনেস্কোর সদর দপ্তর নিমিষেই ঢাকার কারওয়ান বাজার হয়ে উঠে।

কিছুক্ষন পর তাহিরভাই ফোন দিয়ে ভেতরে ডেকে নেন। দেখা হলো বিশ্বখ্যাত মাইম শিল্পী পার্থ প্রতীম মজুমদার, উদীচি ফ্রান্স শাখার সভাপতি কিরনময় মন্ডলসহ আরো অনেকের সাথে। পার্থদা’র সাথে এইকথা সেই কথায় দারুন আড্ডা জমে যায়।এর মাঝে আসেন নুরভাই। তিনিও মিনিট দশেক জমিয়ে আড্ডা দেন। সুযোগ পেয়ে নুরভাইকে বলেছিলাম, বিদেশে শুধু শিল্পী পাঠালে হবে না। তাদের পছন্দের যন্ত্রশিল্পীদেরও না পাঠালে শিল্পীদের একা কিছু করার থাকে না। তিনি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে জানান, ভবিষ্যতে এরকমটা হবে না।

রাত ন’টায় সাংস্কৃতিক অনুস্টান শেষে তাহিরভাইদের সাথে ইউনেস্কোর সদর দফতর থেকে বের হতে ঝিরিঝিরি বৃস্টি। বাসায় ফেরার পথে কাকভেজা হয়ে যাই।