৩১শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আয়া সোফিয়া ও আমাদের মুসলমানিত্ব

আপডেট : জুলাই ২৬, ২০২০ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ

6

ইমরুল কায়েস

গত কিছুদিন ধরে তুরস্কের আয়া সোফিয়া মসজিদ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিতর্ক লক্ষনীয়। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পুণরায় মসজিদ হিসেবে চালুর সিদ্ধান্তে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পক্ষে লিখছেন কেউ কেউ। কেউ আবার বিপক্ষে। আশ্চর্যের বিষয় হল এই বিতর্কে বিপক্ষে কতিপয় মুসলিমও যোগ দিয়েছেন। তাদের দাবি কাজটি ঠিক হয়নি। বিদেশ বিভুঁইয়ে বসে অনেক বাঙালী মুসলমানও নিজেকে নিরপেক্ষ সাজাতে এরদোয়ানের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করতে ছাড়ছেন না। যদিও এসব লেখায় তুরস্ক ও এরদোয়ানদের কিছু আসবে যাবে না। আচ্ছা যারা বিপক্ষে মত দিচ্ছেন তারা কি একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? উসমানীয়দের পতনের পর থেকে এরদোয়ান আসার আগ পর্যন্ত প্রায় একশ’ বছর তুরস্ক শাসিত হয়েছে বাম ও সেক্যুলার পন্থীদের দ্বারা। ফলে সেখানে একটি বিরাট সংখক মানুষ এই ভাবধারার। বর্তমানে সংখ্যায় এরা কমলেও এখনও অনুল্লেখযোগ্য নয়, যা মাঝেমাঝে আমরা সরকার বিরোধী আন্দোলনের সময় দেখি। এমনকি খোদ আয়া সোফিয়া মসজিদ যে শহরে অবস্থিত সেই ইস্তাম্বুলের মেয়রও বিরোধী পক্ষের। আয়া সোফিয়া ইস্যুতে যাদের গাত্রদাহ হচ্ছে তারা বলুন তো এই ইস্যুতে তুরস্কের বিরোধী পক্ষগুলো মাঠে নেমেছে কিনা? তারা কি আপনাদের চেয়ে কম সেক্যুলার? তাহলে সাত সমুদ্র তের নদী পারের ভিন্ন দেশের এই ইস্যু নিয়ে আপনারা এখানে বিতর্ক করছেন কেন?

তুরস্কের বর্তমান সরকার তো গীর্জাকে সরাসরি মসজিদে রুপান্তর করেনি। যারা বিতর্ক করছেন তাদের সঠিক ইতিহাস জানা দরকার। ৫৩৭ সালে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান গির্জা নির্মান করেন। তখন এটি অর্থডক্স খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হত। তারপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর ইস্তাম্বুল ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের দখলে আসলে ১২০৪ সাল থেকে এটা তাদের উপাসনালয় হয়ে যায়। এরপর ১৪৫৩ সালে উসমানীয়দের কাছে ইস্তাম্বুলের পতন হলে অটোমান সুলতান মেহমেত আয়া সোফিয়াকে নিজ অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করে মসজিদ চালু করেন। এর পাশেই টপকাপি প্রাসাদে বাস করতেন সুলতানরা। মজার বিষয় হল আয়া সোফিয়াকে ক্রয় করে সুলতান মসজিদ চালু করলেও টপকাপি প্রাসদের আরেকটি গির্জাকে কিন্তু গির্জা হিসেবেই রেখে দেন যাতে খ্রিস্টানরা উপাসনা করতে পারেন। সেই গির্জাটি এখনও বর্তমান। বিশ্বাস না হয় আজ যারা বিতর্ক করছেন তারা গিয়ে দেখে আসতে পারেন। সুলতান যদি জোর করে আয়া সোফিয়াকে মসজিদ বানাতেন তাহলে অপর গির্জাটিকে অটুট রাখলেন কেন? সেটিও তো তাহলে মসজিদ বানাতেন, না হয় নিদেনপক্ষে ভেঙে ফেলতেন। কোনটাই কিন্তু করেননি তিনি।

প্রায় পাঁচ শত বছর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর ১৯৩৪ সালে সেক্যুলারপন্থী তুর্কি শাসক মোস্তফা কামাল পাশা পশ্চিমাদের অনুগ্রহ পাওয়ার আশায় আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রুপান্তর করেন। শুধু এই মসজিদই নয় এরকম হাজার হাজার মসজিদ বন্ধ করে দেন তিনি। মেয়েদের হিজাব পরিধান নিষিদ্ধের পাশাপাশি মসজিদে আরবী আযানও বন্ধ করে দেন। এরকম ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী অনেক কাজ করেন তিনি। তুর্কি সমাজে চালু করেন পশ্চিমা সংস্কৃতি। এমনকি আযান চালুর অপরাধে ১৯৬১ সালে কামাল পাশার ভাবাদর্শীরা তুরস্কের দুইবারের প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফাঁসিতে ঝোলান। ইসলামপন্থী এরদোয়ানদের ক্ষমতারোহন ও কিছুদিন পর পর্যন্ত তুরস্ক সেক্যুলার পন্থীদের দ্বারা শাসিত হয়। (২০০২ সালে এরদোয়ানের জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ক্ষমতায় আসলেও তিনি পিএম হতে পারেন নাই। একবছর পর নিষিদ্ধতা উঠলে পিএম হন।২০০০-২০০৭ সাল পর্যন্ত সেক্যুলারপন্থী আহমেদ নেকদেত সেজার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।)

৮৬ বছর পর পাঁচ শত বছরের মসজিদ আয়া সোফিয়াকে আবারও তুরস্ক মসজিদ হিসেবে চালু করেছে। এবার কিন্তু তুর্কি আদালতের সিদ্ধান্তে আয়া সোফিয়ায় মসজিদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তো ভাই আপনি কেন লাফালাফি করছেন? তুর্কিরা তো জোর করে কোন গির্জা বা মন্দিরকে মসজিদ বানায়নি। মসজিদকেই মসজিদ বানিয়েছে, যেটাকে জাদুঘর বানান হয়েছিল। ইউরোপ-আমেরিকায় এখনও অনেক জায়গায় গির্জা কিনে নিয়ে মসজিদ বানানোর চল রয়েছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন। সেসব নিয়ে কিন্তু পশ্চিমাদের মাথা ব্যথা নাই। তাহলে আয়া সোফিয়াকে নিয়ে এত মাতামাতি করছে কেন? উদ্দেশ্য কি? ১৪৯২ সালে স্পেনের মুসলিম শহর গ্রানাডা দখলের পর শত শত মসজিদ পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেন পর্তুগালের রানী ইসাবেলা ও তার স্বামী ফার্ডিনান্দ। কই তা নিয়ে তো পশ্চিমারা টুঁ শব্দ করেন না। এখন আয়া সোফিয়াকে কেন্দ্র করে যেই তারা গলা চড়িয়েছে তাতে আপনিও গলা মেলাচ্ছেন। মনে রাখবেন এসব মসজিদ-গির্জা কিছুই না। পশ্চিমাদের মূল টার্গেট হল এরদোয়ান ও মুসলমানরা। মুসলিম কোন দেশ শক্তিশালী হোক তা চায় না তারা। আর এ কারনেই বিশ্ব মানচিত্রের ছোট্ট একটি জায়গা আয়া সোফিয়া এত গুরুত্ব দিয়ে ফলাও করে প্রচার করছে তারা। এরদোয়ানকে বিশ্ববাসীর নিকট খল নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস চালাচ্ছেন। আর মনের অজান্তেই তাতে শরিক হচ্ছেন আপনি, আপনারা। এরদোয়ান বর্তমানে নানাভাবে নির্যাতিত ও পিছিয়ে পরা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পশ্চিমাদের শত্রুতার এটাই হল মূল কারণ। আর এজন্যই আয়া সোফিয়ার মত মিমাংসিত ইস্যুকে সামনে এনে হৈ চৈ করছেন তারা। (মিমাংসিত বললাম এজন্য যে এটাকে কিনে নেয়া হয়েছিল শত শত বছর আগে)। মুসলমানদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ ও প্রথম কিবলা জেরুজালেমের বায়তুল মোকাদ্দাস বছরের পর বছর অবরুদ্ধ করে রেখেছে জায়নবাদী ইসরাইল। সেটা নিয়ে তো কথা বলেন তারা। তাই জায়নবাদী ও খ্রিষ্টবাদী পশ্চিমাদের ফাঁদে পা না দেয়াই ভাল।

এখন বলবেন ৭/৮ শত বছর আগে আয়া সোফিয়া গির্জা ছিল। হ্যা ছিল। সেটা কিনে মসজিদ করা হয়েছিল। আরে ভাই, দেড় হাজার বছর আগে তো আপনার ধর্মই ছিল না। তখন তো দুনিয়ার সব মানুষ অন্য ধর্মের ছিল। পৃথিবী জুড়ে ছিল মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা। ইসলাম ধর্ম আসার পর মসজিদের জন্ম। তাই বলে কি সব মসজিদ বেআইনি? মাত্র কয়েক শত বছর আগে আপনার পাড়ার মসজিদের জায়গাও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ছিল, কারণ আপনার পুর্ব পুরুষ ছিল অন্য ধর্মের। এক্ষেত্রে কি বলবেন? পাড়ার মসজিদগুলো কি সব বেআইনি? আমরা কি সবাই বেআইনি মানুষ? আর আমাদের মুসলমানিত্ব? সেটাও কি বেআইনি? অহেতুক এসব বিতর্কে না জড়ানোই শ্রেয়।

(ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *