৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আয়রে ভোটার ফিরে আয়

আপডেট : নভেম্বর ১৪, ২০২০ ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

108

আব্দুর রহমান

বাংলাদেশে একটা সময় ভোটকে বলা হতো ‘উৎসব’। কিন্তু ভোটের সেই উৎসবটা হারিয়ে গেছে বলা যায়। ভোট দেয়াটা এ দেশের মানুষের কাছে যতটা না অধিকারের বিষয়, যতটা না নাগরিক দায়িত্ব পালনের বিষয় কিংবা সচেতনতার বিষয় তারচে অনেক বেশি হচ্ছে উৎসবের বিষয়, আনন্দের বিষয়। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি কিংবা বয়োবৃদ্ধ ভোটার কারো কোলে চেপে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন এমন ছবি এক সময় পত্রিকার পাতায় ছাপা হতো।

ভোটারদের এমন দীর্ঘ সারি এখন খুব কমই চোখে পড়ে

নির্বাচনী কারচুপি, কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়ার মতো বিষয়গুলো সব সময়ই ছিল কিন্তু তা পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি কিংবা মানুষের আনন্দে একেবারে ভাটার টান ফেলতে পারেনি। কিন্তু গত দু’টি জাতীয় নির্বাচন এবং এ সময়ে স্থানীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচন আর সংসদের উপনির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি খুবই কম। এতই কম যে ভোটার উপস্থিতির হার এক সংখ্যায় নেমে এসেছে।
এ বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকা-১০ আসনে (ধানমন্ডি) উপনির্বাচন হয়। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ২১ হাজার ২৭৫। ভোট পড়ে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১৯ জনে একজনের ভোট পড়েছে। ওই আসনে এমপি হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি এমপি হয়েছেন ১৫ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, কাজী মনিরুল ইসলাম মনু আর হাসান হাবিব সংসদে গেলেন ৫ থেকে ১৫ ভাগ ভোটারের সমর্থন নিয়ে

ঢাকা-৫ এ (ডেমরা-যাত্রাবাড়ি) নির্বাচন হয় গত ১৭ অক্টোবর। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. কাজী মনিরুল ইসলাম মনু ৪৫ হাজার ৬৪২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন অথচ এ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় পৌণে পাঁচ লাখ। এ আসনে ভোট পড়েছে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
সবশেষ গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-১৮ আসনে (উত্তরা-বিমানবন্দর) উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ হাবিব হাসান। ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৮ ভোটারের এ নির্বাচনী এলাকায় তিনি এমপি হয়েছেন ৭৫ হাজার ৮২০ ভোট পেয়ে। এ আসনে ভোট পড়েছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ।
নির্বাচনের ব্যাপারে আমেরিকা বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে পারে এমন চাঞ্চল্যকর দাবি করা সিইসি কেএম নূরুল হুদা কিন্তু মানতে নারাজ যে ভোটারদের উপস্থিত করার ব্যাপারে কমিশনের কোন দায় আছে। তার মতে এটা রাজনৈতিক দল আর প্রার্থীদের ব্যাপার। কিন্তু কেন ভোটাররা কেন্দ্রে যায় না তা দেখাটাও কি কমিশনের কাজ নয়?
বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ এখন আর ভোট দেয়াকে খুব একটা ফলদায়ী কিছু মনে করে না। সাধারণ ভোটারদের বেশিরভাগই এটা বিশ্বাস করেন যে, ভোট হোক আর যাই হোক কে জিতবেন তা যখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই এলাকায় চাউড় হয়ে যায় তখন মানুষের ভোট দেয়ার বিশেষ কোন কারণ থাকতে পারে না। তারা মনে করেন, ভোট দিলেও যা না দিলেও তা, যে হওয়ার বা যাকে হওয়ানোর তিনি হয়েই আছেন।
মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়েও স্বস্তি পায় না, কেন্দ্রে ঢোকার অন্তত: ৫শ’ মিটার আগে থেকেই এমন একটা পরিবেশ করে রাখা হয় যে, মানুষ ভয়ের সাথে বুঝে নেয় বুথে গিয়ে কোন মার্কাটায় সিল মারলে (ইভিএম এর কারণে বাটনে চাপ দিলে) সে সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরতে পারবে। তাই কেউ কষ্ট করে আর বুথ পর্যন্ত যায় না, অনেক ভোটারই কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরেন আর বাংলাদেশ সরকারের দেয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এরপর আবার তা মানিব্যাগে রেখে দূরের কোন চায়ের দোকানে গিয়ে বসে সুষ্ঠু ভোট আয়োজনের সঙ্গে জড়িত সুঠামদেহীদের নানা ‘হিরোইক’ কাজ-কর্মের কথা শুনে দ্রুত চায়ের বিল দিয়ে ঘরে গিয়ে টিভির পর্দায় চোখ রাখেন।
আওয়ামী লীগ এখনো মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় মাগুরার নির্বাচনই দেশের সবচে’ খারাপ নির্বাচন। আবার জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কথা বলেন। মাগুরার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে নির্বাচনকালীন সরকারের ধারণার দাবি জোরালো হয়, আর সবারই জানা ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা ছিল ওই দাবি বাস্তবায়নে তৎকালীন সরকারের কাছে একমাত্র বিকল্প।
বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বৈরথ, নৌকা-ধানের শীষের লড়াই। আমাদের দেশে একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে যারা দেশে উৎসবমুখর ভোট দেখেননি, ফলে ভোটটা এ দেশের মানুষের কাছে আসলেই যে কত বড় উৎসব তা তাদের বোঝানো অসম্ভব। তাই ভোটের সেই উৎসবমুখর দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলকে। নির্বাচনকে যদি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বলে মনে করেন আপনারা তাহলে জনগণ যাতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি এটা করা না যায় তাহলে কবির মত করে আমরা শুধু বলতে পারবো ‘আয়রে ভোটার ফিরে আয়’। কিন্তু ভোটার আর ফিরবে না।

লেখক: সাংবাদিক