৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আল গোরের কথা মনে আছে!

আপডেট : নভেম্বর ৬, ২০২০ ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

342

আব্দুর রহমান

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ‘ডেডলক’ বা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সংখ্যার দিকে তাকালে চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের জয় নিশ্চিত। প্রেসিডেন্ট হতে প্রয়োজন ২৭০ ইলেকটোরাল কলেজ। তিনি এরই মধ্যে পেয়েছেন ২৬৪টি, আর ৬টি হলেই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। আর ট্রাম্প পেয়েছেন ২১৪ ইলেকটোরাল কলেজ। নির্বাচিত হতে তার লাগবে আরও ৫৬টি ইলেকটোরাল কলেজ।
বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হতে মাত্র ৬টি কলেজ লাগবে আর ট্রাম্পের লাগবে ৫৬টি। কিন্তু সংখ্যাটা যত ছোট দেখাচ্ছে হিসাবটা মোটেও তত ছোট নয়। বাইডেন এগিয়ে আছেন নেভাদা রাজ্যে। ওই রাজ্যের ইলেকটোরাল কলেজের সংখ্যা ৬টি। বাইডেনের দরকারও ৬টি। এই রাজ্যে জয়ী হলেই তিনি পৌঁছে যাবেন ২৭০ এর ‘ম্যাজিক ফিগার’ এ। এ রাজ্যে বাইডেন আর ট্রাম্পের ভোটের ব্যবধান কম, তাই যে কোন সময় বাতাস ঘুরে যেতে পারে। বাইডেন যদি এ রাজ্যে জিতে যান তাহলে বাকি চার রাজ্যে ট্রাম্প জয় পেলেও প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন বাইডেন। আর ট্রাম্প যে রাজ্যগুলোতে এগিয়ে আছেন সেখানে ভোটের ব্যবধান কিছুটা বেশি, তাই ওইসব রাজ্যে বাইডেনের জয় পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তাই বাইডেন সমর্থকদের চোখ এখন নেভাদায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এই অচলাবস্থা কিন্তু এই প্রথম নয় বরং এরচে’ জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০০০ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল গোর। ওই নির্বাচনে দেশে ‘পপুলার’ ভোট বেশি পেয়েছিলন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আল গোর। কিন্তু বুশের চেয়ে পাঁচটি ইলেকটোরাল কলেজ কম পেয়েছিলেন তিনি। সে সময় ফ্লোরিডার ভোট গণনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলে ওই অচলাবস্থা। বিষয়টি আদালতে গড়ায়। ফ্লোরিডার আদালত ৪৫ হাজার ভোট নতুন করে গণনার আদেশ দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টে যান বুশ। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ফ্লোরিডা রাজ্যের কোর্টের আদেশ উল্টে দিয়ে নতুন করে ভোট গণনা বন্ধ করে দেয়। এরফলে নির্বাচিত হয়ে যান বুশ।
ওই রায়ের পর আল গোর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্যকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন। ‘আমি আদালতের সিদ্ধান্তের সাথে মোটেই একমত নই, তবে আমি রায় মেনে নিচ্ছি।’ আল গোরের এই বক্তব্যের সঙ্গে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের ঐতিহাসিক উক্তির সাজুয্য পাওয়া যায়। ভলতেয়ার বলেছিলেন “আমি তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তুমি যাতে তোমার মত অবাধে বলতে পারো, তার জন্য আমি নিজের প্রাণও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত”।

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তার আইনজীবীরা, ফলে এ নির্বাচনের ফলাফল পেতে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে। যদি বিষয়টির রাজনৈতিক সমাধান হয়ে যায় তাহলে পুরো বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে তা নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। ক্ষেপাটে মেজাজের মানুষ হিসেবে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিতি পাওযা ট্রাম্প তার ক্ষমতা ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালাবেন তা সহজেই অনুমেয়। আর বাইডেনও যে ‘সালাম’ দিয়ে সব মেনে নেবেন এমনটা নাও হতে পারে। যদি তেমনটা হয় তাহলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একটা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায়ই পড়বে।
যাইহোক আল গোর প্রসঙ্গে আসি। তিনি শুধু আদালতের রায় মেনেই নেননি, নতুন প্রেসিডেন্টকে সম্মান জানানোর এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনের পর আল গোর মার্কিন রাজনীতি থেকে আড়ালে চলে যান এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। আল গোর ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।