২৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আলো ঝলমলে দিনে বিষন্ন এক দুপুর

আপডেট : অক্টোবর ৩, ২০২০ ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

60

হঠাৎ করে ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রন পেয়েছিলাম জার্মানীর বনে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের কনফারেন্সে যোগ দেয়ার। একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান এন্ড সিইও আব্দুস সালাম একটি সেশনে কী নোট পড়বেন। চেয়ারম্যান স্যারের সাথে একই কনফারেন্সে যোগ দেয়া আমার মতন ক্ষুদ্র মানুষের জন্য বিরাট বিস্ময় ছিল।

দুই হাজার তেরো সালের ১৬ জুন রাতে বন পৌঁছাই। এবারও আমার সাথে ঢাকা থেকে সাংবাদিক চয়ন রহমান সঙ্গী হয়েছেন। তিনি বনে আরেকটি কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছেন। আমরা পাশাপাশি হোটেলে উঠেছি। একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান স্যার উঠেছেন হিলটন হোটেলে। আমার হোটেল থেকে হাঁটাপথে তিন মিনিটের দুরত্ব।
বনে এর আগেও আমার আসা হয়েছিল শিলার ল্যাংগুয়েজ স্কুলের আমন্ত্রনে। সেবারও সঙ্গী ছিলেন চয়নভাই।

ডয়েচে ভেলের কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হয় ১৭ জুন থেকে১৯শে জুন পযর্ন্ত। বিশ্বের ১৪৯টি দেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা এই কনফারেন্সে যোগ দেয় । প্রথম দিন বেলা এগারোটায় দ্বিতীয় অধিবেশনে একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান এন্ড সিইও আব্দুস সালাম বাংলাদেশের গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি হ্যান্ডিক্যামে রেকর্ড করেছিলাম। ঢাকায় আমার পাঠানো রিপোর্টটি সেই রাতের শেষ সংবাদে প্রচারিত হয়েছিল। তখনো জানি না চেয়ারম্যান স্যার কি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কীনোটটি পড়লেন!

স্যারের পঠিত দীর্ঘ প্রবন্ধের ওপর অনেকেই নানান প্রশ্নত্তোরে অংশগ্রহন করেন। দুপুর একটায় অধিবেশন শেষে লবিতে কফি খেতে এসে স্যারের সাথে দেখা।তিনি ইশারায় কাছে ডেকে থমথমে কন্ঠে বললেন, নিউজটা শুনছো?
স্যারের কন্ঠ শুনে ভয় পেয়ে যাই। কোন দুঃসংবাদ না তো? ভয়ে ভয়ে জিগাসা করি,কোন নিউজ স্যার?
-জেবি তোমাকে ফোন দেয় নাই? তামান্না কিছু বলে নাই?
জেবিভাই ফোন দিয়েছে। কিন্তু নিউজের লিংক পাঠানো ছাড়া কিছু বলেনি।

এসময় স্যার আমার ডানহাতটি শক্ত করে ধরেন। বেদনামাখা ভারী কন্ঠে যা বলেন তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
-আতিক স্যার নেই রনি। আমরা রওয়ানা দেয়ার কিছুক্ষন পর তিনি মারা গেছেন।
স্যারের দু’চোখ ছলছল করছে। আমার ভেতরটা কেমন করে উঠলো বুঝাতে পারবো না।
জার্মান আসার দু’দিন আগে গ্রীনরোডের বাসায় নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী স্যারকে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন কে জানতো স্যারের সাথে এই দেখাই হবে আমার শেষ দেখা!
চেয়ারম্যান স্যারের কাছে খবরটি শুনে ভীষন মন খারাপ হলো। চেয়ারম্যান স্যার নিজেও আতিকস্যারকে খুব সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। স্যার নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, ‘আতিক সাহেব শুধু চলে গেলেন না, আমাকে অভিভাবক শুন্য করে গেলেন।’

সুদুর জার্মানীর বনে আমাদের সেদিন কি যে মন খারাপ হলো ! আমার আফসোস শেষ দেখাটা হল না আতিকস্যারের সাথে ।
চেয়ারম্যান স্যার লাঞ্চে যাবার আগে বললেন রাতের ডিনারে তোমার সাথে দেখা হবে। সময়মতন চলে এসো।

আমি বিকেলের সেশনে থাকিনি। মিডিয়া সেন্টার থেকে ঢাকায় ফুটেজ পাঠিয়ে মন খারাপা নিয়ে চলে আসি বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে বসে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা।
আমার সারাটি দুপুর বিষন্নতায় ছেঁয়ে থাকে। আতিক স্যারের সাথে কত স্মৃতি। সেগুলো মনে করে বিষন্নতায়, চোখের জলে ভেসে যায় আলো ঝলমলে এক দুপুর, এক বিকেল।