৩১শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আমার বন্ধু সোহা ও অন্যান্যরা

আপডেট : জুন ৩০, ২০২০ ২:৩৯ অপরাহ্ণ

15

পোল্যান্ডে আমি একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম ২০১৩ সালে। রাজধানী ওয়ারশের প্রানকেন্দ্রে ছিল আমার ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাস। এভিনিউ জেরুজালেমেস্কিতে ছিল আমার অস্থায়ী নিবাস। সেখান থেকে বাস ও মেট্রো চেপে ৪৫ মিনিটের দুরত্বে আমার ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাস ছিল। প্রতিদিন সকাল ৬টায় বাসা থেকে বের হয়ে ফিরতাম বেলা ৩টায়।ফেরার পথে প্রায় সময় সোহা আমাকে বাসায় নামিয়ে দিত।

ওয়ারশে আমার দুইদফা এক বছর থাকতে হয়েছিল। আমার কোর্সমেট সুরাইয়া সোহা ছিল আলজেরিয়ান বংশোদ্ভুত ফ্রান্সের সিটিজেন।পুরো পরিবারই প্যারিসে থাকে। কোর্সের শুরুতেই সোহার সাথে আমার চমৎকার বন্ধুর সম্পর্ক গড়ে উঠে। একটা সময় আমরা দু’জন গভীর প্রেমে হাবুডাবু খেয়েছি। কিন্তু আদাজল খেয়ে প্রেমেরতরী ডাঙ্গায় ভেড়াতে পারিনি। এর জন্য অবশ্য সোহার গোড়া মুসলিম রক্ষনশীল পারিবারই দায়ী। তার ভাই, বাবার একটাই কথা পরিবারের অমতে বিয়ে শাদী করলে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে। সেই ভয়ে আমি যতোটা ভীত ছিলাম, আমাকে নিয়ে তার চেয়ে বেশী সোহা’র উৎকন্ঠা উদ্বেগ ছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা মিউচুয়ালি সরে এসেছি। কিন্তু বন্ধুত্বের টান আগের মতনই রয়ে গেছে।

ওয়ারশতে ক্লাসের বাহিরে সোহার সাথে আমার যতোটা দেখা সাক্ষাত হয়েছে তার চর্তুগুন দেখা হয়েছে প্যারিসে। সোহার বড়বোন সানা আমাদের সম্পর্কের আগাগোড়াই জানতো। প্যারিসে আমার একবন্ধুর মাধ্যমে তার সাথেও আমার দারুন সম্পর্ক গড়ে উঠে। আমি যতোবারই প্যারিস গিয়েছি সানা ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। বেশ কয়েকবার প্যারিসের নামী দামী রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ ও ডিনার করিয়েছেন। সানা দুবাই, সোহা প্যারিস আর আমি কানাডায়। কিন্তু আমাদের তিনজনের বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ আজো অটুট।

পোল্যান্ড থেকে প্রথমবার দেশে ফেরার পর সোহা ও সানার সাথে প্রতিদিন দুই বা ততোধিক ভাইবারে কথা হত। অস্থির করে ফেলত ‘ কবে আসবা, কবে দেখা হবে। দ্রুত আসো, প্যারিসে এবার মাস্তি হবে। ‘
সোহার টানেই সেই সময় আমাকে ঘন ঘন প্যারিস যাওয়া হয়েছে। আসা যাওয়ার সংখ্যাটি নেহাত কম নয়। চৌদ্দবার শুধু প্যারিস গিয়েছি সোহার জন্য।

দুইহাজার তেরো থেকে দুইহাজার পনেরো। এই দুইবছর সোহার সাথে লিটারেলি প্রেমপর্ব চলেছে। ওয়ারশ, প্যারিস, তুলুজ, বার্লিন ও ব্রাসেলস কত শহরে না আমরা গিয়েছি। প্রতিবারই আমাদের সাথে সানা, এলেনা, ইয়েলেস্কু, নিনিত কিংবা দিয়ানা কেউ না কেউ আমাদের সঙ্গী হয়েছে। সানা ছাড়া বাকীরা সবাই আমার কোর্সমেট ছিল। আমরা কোথাও একত্রিত হওয়া মানে হা হা হি হি তে সেই জায়গাটি নরকগুলজারে পরিনত হত। সেইসব কাহিনী নিয়ে লিখতে গেলে ঢাউস সাইজের একটা বই লিখতে হবে।
সেইসব কাহিনী নিয়ে আলাদা করে হয়তো কখনো লিখব।

২০১৫ সালে সোহা প্যারিসে ব্যাংকে জব পেয়ে পুরাদস্তুর ব্যাংকার বনে যায়। ফ্রান্সের জনপ্রিয় ব্যাংক বিএনপিপারিবাসে যোগ দেয়ার পর দ্রুতই তার কর্মদক্ষতা তাকে একটা ভাল অবস্থানে নিয়ে গেছে।
এমনদিন গেছে সোহা বিকেলে ব্যাংক হতে বের হয়ে আমাকে লা পমিয়ের বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে শঁজেলিজে।কিংবা মারিশি। দু’বন্ধু মিলে আড্ডা, ডিনার শেষ করে কখনো কখনো চলে যেতাম সেইন নদীর পাড়ে ফ্রাঁসোয়া মিঁতেরা বিবেলথেক। ফরাসী ভাষায় বিবেলথেক মানে লাইব্রেরি। নদীর তীরে ভেড়ানো ভাসমান বোট থেকে কাঠের ব্রীজ লাইব্রেরির সাথে সংযুক্ত। চাঁদের আলোয় আমরা বোটে বসে নানান গল্প করে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছি। আবার কখনো উইকএন্ডে প্যারিসনাইট ক্লাবে পানাহারে চুর হতাম। সোহার কারনে আমাকে বেশ ক’বার শিসাবারে যেতে হয়েছে। সোহার কাছে জেনেছিলাম, আরবীরা নাকি অন্যান্য নেশা হতে শিসা খুব বেশী পছন্দ করে। কারনটা
কি জানতে চেয়ে সুদুত্তর পাইনি।

সোহা ও সানার সাথে ২০১৭ সালে লুভ্যর মিউজিয়াম দ্বিতীয়বার দেখতে গিয়েছিলাম। একদিন পড়ন্ত বিকেলে সোহার সাথে মাঁরিশি’র এক কফিশপে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ সোহা বললো, অনেক কিছু দেখলে কাল চলো ল্যুভরটা ঘুরে দেখি।
এতো দেখি মেঘ না চাইতে জল। আমি সুযোগটা হাতছাড়া করতে রাজী নই। সাথে সাথে বলি,
অবশ্যই দেখব। কালই যাবো আমরা।
কফিপান করতে করতে দুইজনে মিলে ঠিক করি ল্যুভরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য আর বাঁছাই করে কয়েকটা পেন্টিং দেখব।

পরের দিন খুব সকালে আমি ল্যুভর মিউজিয়ামে চলে আসি। সকাল ন’টায় সোহা ও তাঁর বড়বোন সানা চলে আসে। প্যারিসের আবহাওয়া ভাল থাকায় সকাল থেকেই প্রচুর ভীড়। আমরা তিনজনেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ১৬ ইউরো করে তিনটি টিকেট ৪৮ ইউরোতে কেটে সিকিউরিটি পেরিয়ে পিরামিডের ভেতরে ঢুকে পড়ি। মজার ব্যাপার হচ্ছে , ২৫ বছরের নিচের ইউরোপিয়ান নাগরিকদের জন্য মিউজিয়ামে টিকেট লাগে না এবং বেকারদেরও লাগে না।

সারাদুপুর ল্যুভর মিউজিয়াম ঘুরে আমরা ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ফেরার পথে সানা আমাদের নিয়ে যায় মাঁরিশি।সেখানে আমরা একটা ফ্রেঞ্চ রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করি।

এটাই ছিল সোহার সাথে আমার প্যারিসে শেষ দেখা।
এর কিছুদিন পর আমি দেশে ফিরে আসি। এ যাত্রায় বন্ধুদের মধ্যে এলেনা, ইয়েলেস্কু, নিনিত ও দিয়ানার সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে স্পেনিশ বন্ধু শিরিন, ব্রিজিত , সেলিয়ার সাথে। অনেকের সাথে অনিয়মিত ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসআপে যোগাযোগ হয়।
যেখানেই থাকি না কেন খুব মিস করি আমার প্যারিসের বন্ধুদের। মিস ইউ ফ্রেন্ডস।