২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আন্দোলনের আইন কেন পাশ হয় সংসদে?

আপডেট : অক্টোবর ১৫, ২০২০ ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

119

আব্দুর রহমান

জন আন্দোলনে বা দাবির প্রেক্ষিতে দেশে আইনের আরো একটি সংশোধনী এলো। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারায় সংশোধনী এনেছে। জন আন্দোলনের মুখে দেশে আইনের সংশোধনী আসাটা এখন যেন নিয়মিত বিষয় হয়ে উঠেছে। গত সাত বছরে অন্তত: চারটি বড় ধরণের সংশোধনী এসেছে প্রচলিত আইনে আর এর সবগুলোই এসেছে জন আন্দোলনের মুখে।
জন আন্দোলনের মুখে আইনে সংশোধন আনা কিংবা নতুন আইন প্রণয়ন করা দোষের কিছু নয় বরং এটাকে জনগণের দাবির প্রতি সরকারের সম্মান দেখানো বলেই ধরে নেয়া যায়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জন আন্দোলন কিংবা নাগরিকের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আইনে সংশোধন করা হয়েছে এমনটা বলার সুযোগ কম, বরঞ্চ বলা যায় এখানে জন আন্দোলনের দাবি মেনে নেয়া হয় রাজপথের ক্ষোভ আর উত্তাপ যাতে সরকারকে ষ্পর্শ করতে না পারে তা নিশ্চিতের জন্য। বিষয়টা যাই হোক, সরকার জন আন্দোলনের মুখে দাবি মানতে বাধ্য হচ্ছে সেটাই বড় কথা, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে সংসদের কার্যকারিতা বা ভূমিকা নিয়ে। আমাদের দেশে আইন প্রণয়নের এখতিয়ারসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় সংসদ। সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল আমাদের দেশে, তাই সংসদকে বিভিন্ন সময় ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেই বলেছি গত সাত বছর ধরে দেশে জন আন্দোলনের মুখে আইনের চারটি বড় ধরণের সংশোধনী এসেছে। প্রথমেই বলি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের কথা।

২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামির নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ওই রায়ে সংক্ষুব্ধ তরুণরা শাহবাগে জড়ো হন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ।
গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার ট্রাইব্যুনালের আইনে সংশোধনী আনে। প্রচলিত আইনে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আসামী পক্ষের উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সরকার তথা রাষ্ট্রপক্ষের সে সুযোগ ছিল না। সংশোধিত আইনে সুযোগের সমতা সৃষ্টি করা হয়। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ পায় সরকার। অবশেষে আপিল বিভাগের চূান্ত রায়ে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড হয়, যা কার্যকর হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকারের প্রচলিত আইন পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে কোটা বাতিল করার বিষয়টি।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে ছাত্ররা। জানুয়ারি মাস থেকে এ আন্দোলন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি কোটা সংস্কারের ১০ দফা দাবিতে কর্মসূচী পালিত হয় শাহবাগে। ৮ই এপ্রিলের পর কোটা সংস্কারের পক্ষে বিক্ষোভ বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ কর্তৃক কোটা সংস্কার আন্দোলনকর্মীদের উপর বিভিন্ন রকমের ধরপাকড় হয়। তখন দেশবরেণ্য বিভিন্ন লেখক, শিক্ষক কোটা সংস্কার আন্দোলনকর্মীদের পাশে দাঁড়ান।
শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও অবস্থান কর্মসূচির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের দাবি মেনে নিয়ে, ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সব কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।
মন্ত্রিসভা ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে (যেসব পদ আগে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরি বলে পরিচিত ছিল) নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। ওই বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমান বন্দর সড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রী নিহত হয়। এই সড়ক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা শহরের ট্রাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। তারা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে গাড়ি আটকে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে কিনা তা পরীক্ষা করে; লাইসেন্সহীন চালক ও চলার অনুপযোগী গাড়িসমূহ ধরে ট্রাফিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ও তাদের মামলা নিতেবাধ্য করে।
পথচারীদের ট্রাফিক নিয়ম মানানো এবং স্থানবিশেষে রাস্তা পরিষ্কার ও সংস্কারও করতে দেখা যায় তাদের। সাধারণ মানুষ তাদের কার্যক্রমের প্রশংসা করে এবং ট্রাফিক নিয়েন্ত্রণে পুলিশ তাদের সহায়তা করে; অনেকস্থানে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফুল ও চকলেট বিনিময় হয়।
৬ আগস্ট মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে, যে আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়।

২০২০ সালের ৪ অক্টোবর নোয়াখালীতে এক নারীকে (৩৭) বিবস্ত্র করে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
৯ অক্টোবর বিকেলে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশে নারী নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করে আইন সংশোধনের কথা বলেন। ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়, যা আগে ছিল যাবজ্জীবন। পরের দিন অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি হয় আইনের সংশোধন নিয়ে।

শিক্ষার্থীদের আরেকটি সফল আন্দোলন ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে। ২০১৫ সালে বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ১০ শতাংশ এবং পরে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পুরো ভ্যাট বাতিল করতে বাধ্য হয়।

‘গণ আন্দোলন’ কিংবা জন আন্দোলনের মুখে সরকারের দাবি মেনে নেয়ার অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। সরকারের নির্বাহী বিভাগ সে আইনগুলো নীতিগতভাবে অনুমোদন করে। পরে সময় আর সুযোগে সংসদ তা অনুমোদন করে দেয়। সংসদের এমন ব্যবহার আসলে যারা সংসদকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ বলেন তাদের পালেই হাওয়া দেয়। দেশের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন আর প্রণয়ন করাই হচ্ছে সংসদের কাজ ও ক্ষমতা। কিন্তু আমাদের সংসদ মানুষের জন্য কোন আইনটি প্রয়োজন, কোন আইনে সংশোধন আনা প্রয়োজন সে ব্যাপারে ‘ডেডিকেটেড’ আলোচনা কি কখনো করেছে? সংসদে উত্তাপ ছড়ানো আলোচনা আর বাদ-বিসম্বাদের পুরোটাই রাজনৈতিক ইস্যুতে।
সংসদে আছেন রাজনীতিতে পোড়খাওয়া নেতৃবৃন্দ, মানুষের চাওয়া, জাতির প্রয়োজন এসব তাদের অজানা নয়, কোন আইন করা প্রযোজন, কোন আইনে সংশোধনী আনা প্রয়োজন সে ব্যাপারে সংসদে আলোচনার ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। সংসদ সদস্যরা নিজেরা এ ধরণের আলোচনার সূত্রপাত করলে তা সংসদকে সত্যিকার অর্থেই অর্থবহ ও কার্যকর করে তুলতে পারে। আন্দোলনের ফলে আইনের সংশোধনী সরকার আনবে আর সংসদ তা পাস করে দেবে তা কেন? সংসদ যেহেতু জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান, তাই মানুষের ভাবনা আর চাহিদাগুলো সরকারের আগে সংসদ থেকেই উচ্চারিত হোক।
সংসদকে বলা হয় ‘মহান সংসদ’। সুরম্য অট্টালিকা বিবেচনায় একে ‘মহান’ বলা হয় না, ‘মহান’ বলা হয় সংসদ প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্দেশ্যের কথা মাথায় রেখেই, কিন্তু কার্যকারণের বিচারে আমাদের সংসদ কতটা মহান হয়ে উঠতে পেরেছে এ প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়।

 লেখক: সাংবাদিক




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *