৩০শে জুলাই, ২০২০ ইং | ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অস্বস্তির নগরে স্বস্তির ভ্রমন

আপডেট : জুন ১, ২০২০ ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

33

আব্দুর রহমান

আবার বদলে যেতে শুরু করেছে ঢাকা। গতকালের ঢাকা আর আজকের ঢাকার মাঝে পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো। সরকারি- বেসরকারি অফিস আদালত খুলেছে গতকাল ৩১ মে। আর গণপরিবহন চলাচল শুরু হয়েছে আজ। যদিও গতকাল রোববার থেকেই ট্রেন আর লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে, বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বাস চললেও আজ বাস চলাচল শুরু হয়েছে সরকারি ঘোষণা মেনে।

রাজধানীর সায়েদাবাদের ধলপুর এলাকার বাসা থেকে বিসমিল্লাহ বলে বের হলাম। যাদের সাথে দেখা করবো এমন দু’একজনের সাথে মোবাইলে কথা বললাম। হাটতে হাটতে বাস স্টপেজে গিয়ে হাজির হলাম। গোলাপবাগ মাঠের পশ্চিম পাশে, দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, চারিদিকে তাকালাম, এখানে আমার নতুন করে দেখার কিছু নেই, সবকিছুই চেনা। কিন্তু তারপরও তাকালাম। ‘স্বাগতম সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল’ ‘মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার’ এ ওঠার আর নামার লুপ। খানিক দূরে হুজুর সায়দাবাদীর মসজিদের মিনার আর তার নিজের থাকার ভবন দেখা যাচ্ছে। এরমধ্যেই ল্প একটু জায়গায় গাছপালা আছে, সুন্দর সবুজ সেই অংশটুকু। সবকিছুতে কেমন যেন একটু পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া, প্রকৃতিই পরিবেশটাকে পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে।

একের পর এক গাড়ি আসছে, বলাকা, লাব্বাইক, তুরাগ, সালসাবিল, লাভলি, অনাবিল। অবাকই হলাম গাড়িগুলোতে ওঠা নিয়ে খুব একটা তাড়াহুড়া নেই মানুষের। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, মানুষ আসছে আর উঠছে।
‘লাব্বাইক’ পরিবহনের একটি গাড়ি এলো। কোন রকম ঝামেলা আর হুড়াহুড়ি ছাড়াই উঠতে পারলাম, ওঠার সময় বাসের কন্টাক্টর হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিলো। করোনা আতংকে ভীত মানুষ, তাই এই সতর্কতা। গাড়িতে উঠে দেখি প্রত্যেকটি আসনে একজন একজন করে বসা। পেছনের দিকে একটি আসনে বসে পড়লাম। গাড়িতে উঠেই আসন পাওয়া কম সৌভাগ্যের বিষয় না।
গাড়ি চলছে, মানিকনগর, টিটিপাড়া, মুগদাপাড়া, কমলাপুর, বৌদ্ধমন্দির, বাসাবো দিয়ে গাড়িটি ছুটছে। পথে কেউ উঠছেন কেউ নামছেন। ভাড়ার বিষয়টা কি হয় সেদিকে আমার বিশেষ নজর ছিল। দু’একজন এক-আধটু তর্ক করলেও যুঁত করতে না পেরে রণেভঙ্গ দিল।
খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে গাড়িটি এলো পুলিশ ফাঁড়ি, চারদিকে তাকাচ্ছি, মানুষজনক খুব কম। এই রোদ ওঠে আবার পরক্ষণেই তা কোথায় যেন হারিয়ে যায়, আমি ভাবছি এই নগরীর মানুষগুলো কোথায় হারিয়ে গেলো!

গাড়িতে দু’জন ওঠে, কখনো একজন নামে, কিন্তু কোন মানুষই ‘আসন’ ছাড়া নেই, কেউ দাঁড়িয়ে নেই। তারপরও কেউ উঠলে অন্যরা তার দিকে তাকিয়ে থাকে, যদি সে পাশের আসনে বসে পড়ে! তবে মানুষ ঠেকে শেখে আবার দেখেও শেখে, মনে হচ্ছে গাড়ির সব আরোহীই দেখে শিখে ফেলেছে যে একজনের পাশে আরেকজন বসা যাবে না, সামাজিক দূরত্ব বলে কথা! এ এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা!
কন্টাক্টর ভাড়া নিতে এলো, ভাড়া চুকালাম, একটু আহ্লাদি গলায় জিজ্ঞেস করলাম, কেমন চলতেছে? মুখে দায়িত্বশীলতার হাসি দিয়ে বললো আপনাদের সুবিধার জন্যইতো সব! আপনার নিরাপদ থাকলেই আমরা নিরাপদ।
মালিবাগ রেলগেট পেরিয়ে মৌচাক হয়ে ডানে মোড় নিয়ে গাড়িটি ছুটছে মগবাজারের দিকে। আরো অনেক গাড়ি, অনেক নাম্বারের গাড়ি, নানা গন্তব্যের গাড়ি। সেগুলোর দিকে তাকালাম, সেগুলোতেও মোটামুটি শৃঙ্খলা আছে, আসনের চাইতে বসা লোকের সংখ্যা কম।

মগবাজার পেরিয়ে ইস্কাটন রোড হয়ে গাড়িটি চলে এলো বাংলামোটর। আমি গন্তব্যে এসে গেছি। নামার সময় আরেকবার হ্যান্ডস্যানিটাইজার চেয়ে হাতে মাখালাম।
চারিদিকে তাকাচ্ছি, মানুষ যাচ্ছে আসছে, কিন্তু ব্যস্ততাটা একটু কম, সবাই হাঁটছে, তবে কেউই হন্তদন্ত হয়ে দৌঁড়াচ্ছে না। হাটতে হাটতে আমার কাঙ্ক্ষিত স্থানে এসে পড়লাম, কথাবার্তা আর এরমধ্যে একবার বিস্কুট আর দু’বার চা। দেখতে দেখতে ঘন্টা দুই কেটে গেল। বুঝি একেই বলে আড্ডা!
খানিকপরে নিচে নেমে আবার গাড়ির সন্ধান। বাংলামোটর ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে আছি, গাড়ি আসছে কম, যাও আসছে থামছে না, থামবে কী করে! সব গাড়িই যে অর্ধপূর্ণ! আর ওঠানোর সুযোগ নেই, একটা গাড়িতে উঠতে পারলাম, গাড়ির নাম শিকড়। চেনা রাস্তা ধরে চলছে গাড়ি, পরীবাগ, শাহবাগের রাস্তা দিয়ে গাড়িটি ছুটছে, কোন যানজট নেই, গাড়িতে গাড়িতে পাল্লা নেই, মধ্যমগতিতে গাড়ি ছুটছে। শাহবাগ মোড়ে কিছু গাড়ি বিক্ষিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তারা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে! এই নগরীতে যাত্রীর জন্য গাড়ির অপেক্ষার দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য খুব বেশি হয় না, গাড়ির জন্য মানুষের বিরক্তিকর অপেক্ষাটাই বরং এখানে নিত্যদিনের চিত্র।

শাহবাগ দিয়ে বামে মোড় নিয়ে গাড়িটি ছুটছে, রমনা পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, রমনা পার্কটা এত সবুজ সাজে আগে কখনো সেজেছে বলে মনে হয় না, হয়তো সাজতো কিন্তু আমাদের দৌঁড়েচলা জীবনে তা দেখার হয়তো ফুরসৎই হয়তো হয়নি।
মৎস্যভবনে পেরিয়ে গাড়ি যাচ্ছে প্রেসক্লাবের দিকে। হাইকোর্টের সামনে দু’ তিনটি গাছ ভেঙে পড়েছে ঝড়ে। প্রেসক্লাব বরাবর রাস্তার উত্তর পাশে মানুষের উপস্থিতি বেশ! তবে আমরা যে গাড়ির আরোহী সেটি থামছে না, লোকজন দৌঁড়ে এসে হতাশ হয়ে থেমে যাচ্ছে!
পুরানা পল্টন দিয়ে গাড়ি ডামে মোড় নিয়ে গুলিস্তানের পথ ধরলো, ডানে সচিবালয় আর বামে জিপিও। গতকাল থেকে অফিস খুলেছে কিন্তু অন্য সময় এই এলাকায় সচিবালয়মুখো মানুষের যে চলাচল তার কিছুই ছিল না।, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, গুলিস্তান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে বঙ্গভবনে সামনে চলে এলো বাসটি। বঙ্গভবনের সামনের পার্ক দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে,, পার্ক পেরুলেই ওপারে ঠাটারি বাজার। গাড়ি ছুটছে, কোন হাকডাক নেই,যাত্রী ডাকাডাকি নেই। এ এক অপরিচিত বাসযাত্রা।

টিকাটুলি ইত্তেফাক হয়ে রাজধানী মারকেটের পাশ দিয়ে স্বামীবাগ আর করাতিটোলা পেরিয়ে গাড়িটি চলে এলো সায়েদাবাদ। সায়েদাবাদ ব্রিজে নেমে হাটাপথের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। মনে মনে ভাবছি, এই পথটুকু আসতে কমপক্ষে দেড় ঘন্টা সময় লাগতো, এখন লাগলো আধাঘন্টা।
ঢাকা শহরে এমন স্বাচ্ছন্দ্য চলাচলের কথা আমরা ভাবি, কিন্তু সেটা শুধু ভাবনারই বিষয় বলে মনে হতো এতদিন। দুই ঈদেও ঢাকা এমনই ফাঁকা থাকে, সে ফাঁকা ঢাকার সবাই উপভোগ করে, বউ বাচ্চা নিয়ে অনেকেই ঘুরতে বের হন। এখনকার ঢাকার জীবন অস্বস্তির জীবন, গায়ে গা লাগলে বিপদ হতে পারে! তাই সবাই ভীত আর সতর্ক, গায়ে গা লাগানো যাবে না।
এখনকার ফাঁকা ঢাকায় প্রমোদভ্রমণের সুযোগ নেই, সুযোগ নেই ঘুরতে বেরুনোরও, যারা বেরিয়েছেন জরুরি কাজে বেরিয়েছেন আবার কাজ শেষ করেই তারা ঘরমুখো হয়েছেন, তাই ফাঁকা ঢাকাটা ঘুরে দেখানোর কথা ভুলে যান, জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া লাগলে বের হবেন, তবে খবরদার মাস্কের কথা ভুলে যাবেন না। জানেন নিশ্চয়ই মাস্ক না পড়লে জরিমানা হবে। কত হতে পারে জানেন তো? এক লক্ষ টাকাও হতে পারে।